গতকাল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রফতানিকারকরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগে থেকেই দুশ্চিন্তায় ছিলেন তারা। এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত। পরিস্থিতি শান্ত না হলে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াসহ ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অবধারিতভাবে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আট মাসে পণ্য রফতানির অর্থমূল্য ছিল ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয় ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের। এ হিসাবেই রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিশ্ববাজারে পণ্য রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। কিন্তু এর পরের সাত মাসে টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেশের রফতানি খাতে। জানুয়ারিতে (২০২৬) নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৫০ শতাংশ। ইপিবি কর্তৃক গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
এদিকে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেখা গেছে রফতানি ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তিতে। ১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটর্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ ও নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে রফতানির গতিপ্রকৃতি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের নেতারা।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সদ্য সমাপ্ত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রফতানি হয়েছিল ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য। এ হিসাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থমূল্য বিবেচনায় পণ্য রফতানি কমেছে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
এর আগে গত জানুয়ারিতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয় দশমিক ৫০ শতাংশ। ডিসেম্বরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। নভেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমে যায় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অক্টোবরে কমার হার ছিল ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছিল ঋণাত্মক ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। আগস্টে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য বলছে, অর্থবছরের আট মাসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। এ খাতের মধ্যে নিটওয়্যার ওভেন পোশাকের তুলনায় শক্তিশালী পারফরম্যান্স অব্যাহত রেখে নিজের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বলে জানিয়েছে ইপিবি। সংস্থাটির দাবি, ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমার হারটি ‘সামান্য’। রফতানির সার্বিক চিত্র বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এ খাতের স্থিতিশীলতাকে নির্দেশ করে বলে মনে করছে ইপিবি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, সামগ্রিক রফতানিতে সামান্য হ্রাসের কারণ হিসেবে বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, জাতীয় নির্বাচন এবং প্রধান বাজারগুলোতে বৈশ্বিক চাহিদার মন্দার মতো সাময়িক বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হালকা প্রকৌশল, হিমায়িত মাছসহ বেশ কয়েকটি প্রধান খাত বছরওয়ারি ভিত্তিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা বাংলাদেশের রফতানি বাস্কেট বৈচিত্র্যকরণের প্রতিফলন ও উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে মনে করছে ইপিবি।
ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের আট মাসে অর্থমূল্য বিবেচনায় মোট রফতানির ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক পণ্য। এ পণ্যসংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা রফতানির বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি ডিক্লাইন হবে, এটাই স্বাভাবিক, কারণ মাসটাই ছিল ছোট। তারপরে ইলেকশন উপলক্ষে বাড়তি বন্ধ ছিল। মার্চেও ডিক্লাইনিং হবে। আমরা আশাবাদী ছিলাম যে এপ্রিল ও আগামী দিনগুলোতে ভালো হবে। কিন্তু যুদ্ধটা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটার ওপর সব নির্ভর করছে।’
টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় খারাপ কাজ যেগুলো হয়েছিল, সেগুলোর প্রভাবে নন-পারফর্মিং লোন ব্যাপকভাবে বেড়ে গেল। এরপর দেখা দিল মূল্যস্ফীতি। আমাদের খরচ বেড়ে গিয়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। আবার রাজনৈতিক কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। ট্রাম্পের ট্যারিফের কারণে অনেক কারখানা ক্রেতাও হারাল। এরপর নির্বাচন হবে কি হবে না, এ অনিশ্চয়তায় ক্রেতারা বেশ রক্ষণশীল ছিল। সবকিছু মিলেই নেগেটিভ হবে, সেটা তো অবধারিত। অনেকগুলো সমস্যার সমাধান হচ্ছে। যেমন নির্বাচনটা ভালোভাবে হয়ে গেছে। আস্থা ফিরে আসছে। মূল্যস্ফীতিও নিচের দিকে যাচ্ছে।’
নতুন ক্রয়াদেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘ক্রয়াদেশের অবস্থা আমরা আশা করছি এপ্রিল অনওয়ার্ড ভালো হবে। কিন্তু যুদ্ধ যদি অন্যদিকে মোড় নেয় তাহলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়ে আরো উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির যে রফতানিতে ১২ শতাংশ নেতিবাচক দেখানো হয়েছে, আমার কাছে মনে হচ্ছে যে এটা আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল। প্রথম কারণ হচ্ছে এমনিতেই তো আমাদের রফতানি কমছিল। দ্বিতীয়ত, এ মাসে নির্বাচনের কারণে ক্রেতারা রফতানি টার্গেট কম রেখেছিল। তৃতীয়ত, ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১২ দিন কাজ হয়নি। ফলে রফতানি আরো কমার কথা ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এতদিন আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। সেই খড়্গ এখনো চলছে। এর মধ্যে আবার মার্কিন-ইরান যুদ্ধ সামনের দিনগুলোতে রফতানি আরো ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ফলে রফতানি আরো কমে যাবে। আমাদের হাতে এ মুহূর্তে যে ওয়ার্ক অর্ডারের ফোরকাস্ট আছে, তাতে আগামী তিন মাসে এটা ইমপ্রুভ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আবার যুদ্ধের কারণে তো সময় ও খরচও বেড়ে যাচ্ছে।’
ইপিবি জানিয়েছে, রফতানি গন্তব্যের ক্ষেত্রে ৫৮৭ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম বাজার হিসেবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং দশমিক ৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে চীন সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রবৃদ্ধির হার ১৯ দশমিক ১২ শতাংশ।